সোমবার, মার্চ ২, ২০২৬
Homeরাজনীতিআ.লীগ নিয়ে, সব জোটে ছাড়াছাড়ি

আ.লীগ নিয়ে, সব জোটে ছাড়াছাড়ি

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল: নির্বাচনের দিন যত কাছে আসছে, বরিশালের রাজনীতির ছবি ততই ঘোলাটে হচ্ছে। ওপর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে লড়াইটা সোজা, বিএনপি বনাম বাকি সবাই। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই সেই সরল অঙ্ক ভেঙে যায়। এ জেলার ছয়টি আসনের প্রতিটিতে রয়েছে আলাদা গল্প, আলাদা টানাপোড়েন,আলাদা হিসেব।

কোথাও নিজের দলের বিদ্রোহী বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, কোথাও জোট ভাঙার সুযোগে মাথাচাড়া দিচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বা জামায়াত। কোথাও আবার জাতীয় পার্টির পুরনো প্রার্থীর অভিজ্ঞতা নতুন করে হিসেব পাল্টে দিচ্ছে। সবকিছুর মাঝখানে এক নীরব কিন্তু প্রভাবশালী শক্তি। সেই শক্তি নির্বাচনে না থাকলেও ভোটের মাঠে বড় ফ্যাক্টর হয়ে থাকা আওয়ামী লীগের ভোটার।

এই ভোটগুলো কার বাক্সে যাবে, সেটাই অনেক আসনে জয়-পরাজয়ের সীমারেখা টানতে পারে। ফলে বরিশালের ছয়টি আসনের কোনোটি নিয়েই এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলার সুযোগ নেই। বাইরে শান্ত প্রচারণা, ভেতরে তীব্র হিসাব-নিকাশ। বরিশালের ভোট তাই শুধু দল বনাম দল নয়, এটা ভাঙা সমীকরণ আর অদৃশ্য শক্তির এক জটিল রাজনৈতিক খেলা।

বিএনপির শক্ত ঘাঁটি, কিন্তু ভেতরে ফাটল
বরিশাল ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির জন্য স্বস্তির জেলা। স্থানীয় নেতারা এখনো দাবি করছেন, সব আসনেই ধানের শীষ এগিয়ে। দলের পরীক্ষিত প্রার্থীদের ওপরই ভরসা রেখেছে কেন্দ্র। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। একাধিক আসনে পুরনো ক্ষোভ, মনোনয়ন বঞ্চনা আর বিদ্রোহী প্রার্থী সেই স্বস্তির জায়গায় বড় প্রশ্নচিহ্ন বসিয়েছে।

চরমোনাই পীরের কেন্দ্র হওয়ায় বরিশালে ইসলামী আন্দোলনের একটি স্থায়ী ভোটব্যাংক রয়েছে, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অজানা নয়। জেলার দুইটি আসনে দলটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম প্রার্থী হওয়ায় সেই প্রভাব আরো দৃশ্যমান। জামায়াতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট না হলেও ‘ওয়ান বক্স’ নীতিতে ইসলামপন্থী ভোট একত্র করার চেষ্টা চলছে।

একই সঙ্গে অন্তত চারটি আসনে সক্রিয় জামায়াতে ইসলামী। কোথাও নিজেদের প্রার্থী, কোথাও জোটসঙ্গীর পক্ষে মাঠে নামিয়েছে সংগঠন।

বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া)
এই আসনেই জট সবচেয়ে স্পষ্ট। বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি জহির উদ্দিন স্বপনের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন দলেরই স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুস সোবহান। তৃণমূলে স্বপনকে নিয়ে চাপা অসন্তোষ র‌য়ে‌ছে। ২০০১ সালের সংখ্যালঘু নির্যাতনের স্মৃতি, আগৈলঝাড়ায় সংখ্যালঘু ভোটের উপস্থিতি এবং আব্দুস সোবহানের স্থানীয় প্রভাব মিলিয়ে এখানে ভোট ভাগ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। সেই ফাঁকে জামায়াত প্রার্থী কামরুল ইসলাম খানও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন।

বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর)
তুলনামূলক শান্ত এই আসনে বিএনপি রয়েছে স্বস্তিতে। বিদ্রোহী নেই। তবে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও জাতীয় পার্টির উপস্থিতি ফলের ব্যবধান কমাতে পারে। এখানে আওয়ামী সমর্থক ও সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যায়, সেটাই মূল প্রশ্ন।

বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী)
সবচেয়ে জমজমাট লড়াইয়ের আসন এটি। বিএনপির অ্যাড. জয়নুল আবেদীন, এবি পার্টির ফুয়াদ এবং জাতীয় পার্টির চারবারের সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপু। এই অবস্থানই বলে দিচ্ছে এই আসনে তিনমুখো লড়াই হবে।

জামায়াত এখানে নিজেদের প্রার্থী না দিয়ে এবি পার্টিকে সমর্থন করছে। কারাগারে থেকেও টিপুর প্রভাব কম নয়, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ভোট তার দিকে যেতে পারে বলে ধারণা। বিএনপির ভেতরের বিভক্তি এখানে বড় দুর্বলতা।

বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ)
ভোটের ইতিহাসই বলে দেয়, এই আসন পূর্বাভাস মানে না। কখনো বিএনপি সরকারে থেকেও এখানে জিতেছে আওয়ামী লীগ, আবার কখনো ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। এবার আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকলেও তাদের ভোটই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিএনপির প্রার্থী রাজিব আহসান, জামায়াতের জেলা আমির আব্দুল জব্বারসহ পাঁচজন মাঠে।

তবে সাবেক এমপি মেজবাহউদ্দীন ফরহাদ মনোনয়ন না পাওয়ায় বিএনপির ভেতরে ক্ষোভ স্পষ্ট। সবকিছুর বিবেচনায় এই আসনটি জামায়াতের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রেও বড় ফ্যাক্টর হবেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সৈয়দ এছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের।

বরিশাল-৫ (সিটি-সদর)
বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। মজিবর রহমান সরোয়ার এখানে পরিচিত মুখ। কিন্তু এই আসনেই ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। তাঁর সম্মানে জামায়াত প্রার্থী সরিয়ে নেওয়ায় ইসলামপন্থী ভোট একদিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাসদ প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী এখানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। শহরে তাঁর আলাদা একটি ইমেজ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভোট কোন দিকে যায়, সেটাই ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ)
অতীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি জিতেছে এই আসনে। বিএনপির আবুল হোসেন খান তৃতীয়বারের মতো প্রার্থী। বিপক্ষে ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির ফয়জুল করীম এবং জামায়াতের মাহমুদুন্নবী। জোট ভাঙনের কারণে এখানে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারে।

আওয়ামী লীগ মাঠে নেই, তবু নির্ণায়ক
নির্বাচনের আগে ‘আওয়ামী লীগ ট্যাগ’ দিয়ে গ্রেপ্তার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে ইসলামী আন্দোলনের ফয়জুল করীম যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা এই অদৃশ্য ভোটব্যাংকের গুরুত্বই তুলে ধরে। অন্যদিকে জামায়াত বলছে, ‘ভোটব্যাংক’ ধারণাই এখন আর নেই। বিএনপি বলছে, অতীতের বিতর্কিত নির্বাচনের হিসাব এবার কাজ করবে না।

বরিশাল জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের মতে, এখন আর ‘ভোট ব্যাংক’ বলে আলাদা কোনো ধারণা নেই। তাঁর ভাষায়, আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েই তাদেরকে বিদায় জানিয়েছে।

অন্যদিকে বরিশালকে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করে দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন বলেন, কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়েছিল। তাঁর দাবি, গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের ফলের ওপর ভিত্তি করে যে ‘ভোট ব্যাংক’-এর কথা বলা হয়, আসন্ন নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে সেটির তেমন কোনো প্রভাব থাকবে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন বরিশালের সম্পাদক ও স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক রফিকুল আলমের মতে, জটিল সমীকরণ আর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি যেকোনো সময় সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে। কালের কন্ঠ.

এ জাতীয় আরো সংবাদঃ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদঃ

সাম্প্রতিক মন্তব্য