অনলাইন ডেস্ক. চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করিমের রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম পীরের ভাই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সিটি-সদর) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে দলীয় মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন তিনি।
নির্বাচনী কার্যালয়ে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ফয়জুল করিমের নিজের অস্থাবর সম্পদের তুলনায় প্রায় দশ গুণ।
স্ত্রীর পেশা ব্যবসা উল্লেখ করলেও আয়ের উৎস অজানা। অথচ ২০২৩ সালের বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় স্ত্রীর কোনো আয় বা সম্পদের তথ্য ছিল না। সেখানে তাঁকে শুধু গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণ করলে আয়, সম্পদ ও পেশাগত পরিচয় নিয়ে একাধিক অসংগতি চোখে পড়ে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও এর আগে অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য মিলিয়ে দেখলে ফয়জুল করিমের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
স্ত্রীর সম্পদে হঠাৎ বড় উল্লম্ফন
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় ফয়জুল করিম উল্লেখ করেছেন, তাঁর স্ত্রীর মালিকানায় রয়েছে ১৮৭ ভরি স্বর্ণালংকার। পাশাপাশি নগদ অর্থসহ স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে তিন কোটি ৪১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে ফয়জুল করিম নিজে তাঁর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছেন ৩৩ লাখ টাকা এবং স্থাবর সম্পদ তিন কোটি ১৫ লাখ টাকা।
তবে স্ত্রীর স্থাবর সম্পদের কোনো বিবরণ হলফনামায় নেই।
স্ত্রীর পেশা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে গৃহিণী ও ব্যবসা। স্ত্রীর নামে পৃথক আয়কর নথিও রয়েছে। সেই নথি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্ত্রীর আয়কর রিটার্নে সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। একই সময় বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ছয় লাখ টাকা এবং আয়কর দেওয়া হয়েছে ১৫ হাজার টাকা।
তবে ব্যবসার ধরন বা প্রকৃতি সেখানে উল্লেখ নেই।
যদিও ২০২৩ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় স্ত্রীর কোনো আয় বা সম্পদের তথ্য ছিল না। সেখানে তাঁকে শুধু গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দুই বছরের ব্যবধানে এত বিপুল পরিমাণ সোনা ও সম্পদের মালিকানা কিভাবে তৈরি হলো, সে বিষয়ে হলফনামায় কোনো ব্যাখ্যা নেই। স্বর্ণালংকার উপহার হিসেবে পাওয়া হয়েছে বলা হলেও, উপহারের উৎস বা সময়কাল উল্লেখ করা হয়নি।
নগদ অর্থে ভরসা, ব্যাংকে প্রায় শূন্য
জাতীয় নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী, ফয়জুল করিমের হাতে নগদ রয়েছে ৩১ লাখ ১২ হাজার টাকা। অথচ ব্যাংকে জমা রয়েছে মাত্র এক হাজার ১৭৬ টাকা। তাঁর স্ত্রীর কোনো ব্যাংক হিসাবের তথ্যও হলফনামায় উল্লেখ নেই। এর আগে সিটি নির্বাচনে তাঁর হাতে নগদ অর্থ দেখানো হয়েছিল প্রায় ৪৫ লাখ টাকা।
নগদ অর্থের এমন উচ্চ পরিমাণ এবং ব্যাংক ব্যবস্থায় প্রায় অনুপস্থিতি স্বাভাবিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই প্রশ্ন উঠছে। জাতীয় নির্বাচনের হলফনামায় তিনি একটি ২২ বোর রাইফেল আগ্নেয়াস্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে সিটি নির্বাচনের হলফনামায় অস্ত্রসংক্রান্ত কোনো তথ্য ছিল না।
আয়ের উৎসে পরিবর্তন
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় ফয়জুল করিম নিজের পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন শিক্ষকতা ও দাওয়াত। সেখানে শিক্ষকতা থেকে বছরে সাত লাখ ছয় হাজার টাকা এবং মাহফিল থেকে চার লাখ টাকা আয়ের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি তিন কোটি ২২ লাখ টাকা মূল্যের দুটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে মাত্র তিন লাখ ২২ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি ব্যবসা থেকে চার লাখ টাকা আয়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু এবারের হলফনামায় ব্যবসা থেকে কোনো আয়ের তথ্য নেই। আয়ের উৎসে এই পরিবর্তনের কারণ হলফনামায় পরিষ্কার করা হয়নি।
জাতীয় নির্বাচনের হলফনামায় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কৃষি ও অকৃষি জমির পরিমাণ ও মূল্য নতুনভাবে দেখানো হয়েছে। সেখানে এসব জমির আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ৩৩ লাখ টাকার বেশি। কিন্তু সিটি নির্বাচনের হলফনামায় জমির পরিমাণ ও মূল্য ছিল ভিন্ন। জমির বর্তমান মূল্য ও অর্জনকালীন মূল্যের মধ্যেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান।
আয়কর রিটার্ন বনাম হলফনামা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফয়জুল করিম নিজের আয় দেখিয়েছেন ১৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছেন এক কোটি ৬৪ লাখ টাকার বেশি। এ জন্য তিনি আয়কর দিয়েছেন ৯৬ হাজার ৪৭৫ টাকা। এর বিপরীতে সিটি নির্বাচনের সময় তিনি আয় দেখিয়েছিলেন সাড়ে ১১ লাখ টাকা, আয়কর দিয়েছিলেন এক লাখ ছয় হাজার ৮০০ টাকা। তখন আয়কর রিটার্নে সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছিলেন ৭৭ লাখ টাকা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), বরিশালের সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, দুটি নির্বাচনের হলফনামা ও আয়কর নথির তথ্য তুলনা করলে আয়, সম্পদ ও পেশাগত ঘোষণায় একাধিক অসামঞ্জস্য সামনে আসে। এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে। নগদ অর্থ, স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদ এবং তার আয়ের উৎস নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

