Site icon Daily R News

সীমান্তবর্তী স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য আমদানি-রপ্তানির আড়ালে মানবপাচার বাড়ছে

অনলাইন ডেস্ক. সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য আমদানি-রপ্তানির আড়ালে মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্র পরিবহন, অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানায় যাতায়াত হতে পারে।

সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাকের চালক ও হেল্পারদের দ্বারা সীমান্ত লাগোয়া দেশগুলোর সঙ্গে স্থলপথে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে ২৪টি স্থলবন্দর আছে। এর মধ্যে ১১টি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চলছে। এসব স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৫৫০ থেকে এক হাজার ৭৫০টি পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করে। এতে একজন চালক আর একজন হেল্পার থাকেন।

তবে তাঁদের আগমন ও বহির্গমন ইমিগ্রেশন পুলিশের মাধ্যমে হয় না। ফলে তাঁদের পরিচয় ও যাতায়াতের তথ্য সংরক্ষিত থাকে না। যদিও একই স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি ও ভারতীয় যাত্রীদের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম যথাযথভাবে হয়।গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ বলছে, স্থলবন্দরগুলোতে ভারতীয় চালক-হেল্পারদের আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন হচ্ছে না।

কারণ তাঁরা কাস্টমসের ইস্যু করা ‘কার পাস’ ব্যবহার করেন। বেশির ভাগ স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের কার্যক্রম না থাকায় যানবাহনের কাগজপত্র ও ভ্রমণ দলিল যাচাই শেষে এন্ট্রি ও এক্সিট সিল দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে আমদানি-রপ্তানিতে নিয়োজিত পণ্যবাহী ট্রাকচালক ও হেল্পারের তথ্য সংরক্ষণ অসম্ভব। কারণ ইমিগ্রেশন ছাড়াই তাঁদের যাতায়াত অব্যাহত আছে।

গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ বলছে, পণ্যবাহী চালক ও হেল্পারদের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে থাকার নিয়ম থাকলেও তাঁরা সীমানা অতিক্রম করছেন।

এমনকি তাঁরা ভেহিকল টার্মিনাল ও স্থলবন্দরের নির্ধারিত এলাকার বাইরেও যাতায়াত করেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানকারী, সাজাপ্রাপ্ত আসামি, স্টপ লিস্টের ব্যক্তিরা চালক বা হেল্পার পরিচয়ে ‘কার পাস’ নিয়ে অবৈধভাবে দেশ ত্যাগ করতে পারেন। ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাকের চালক-হেল্পাররা অপরাধ সংঘটনের পর সহজেই ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। একইভাবে বাংলাদেশিরাও একই পরিচয়ে অপরাধী বা স্টপ লিস্টের কেউ দেশ ত্যাগ করতে পারেন। এ ছাড়া মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্র পরিবহন, নকল পণ্য ও নথিপত্র পাচার, পাশাপাশি অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানায় যাতায়াতসহ বিভিন্ন অপরাধের আশঙ্কা আছে।

এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে বেনাপোল স্থলবন্দরের কার্গো ভেহিকল টার্মিনাল দিয়ে ভারতীয় পণ্যবাহী একটি ট্রাকের (নং-ডই২৫ ঋ ৪৩১০) ভারতীয় চালক বাংলাদেশে প্রবেশের সময় বাংলাদেশি দালাল রাজ্জাকের কাছে একটি ব্যাগ হস্তান্তরের চেষ্টা করেন। পরে আনসার সদস্যদের সন্দেহ হলে ব্যাগটি তল্লাশি করে সার্বিয়ান ভিসাসংযুক্ত ২০টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। পরে সেই ট্রাকচালককে পাসপোর্টসহ বেনাপোল পোর্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়।

ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব মাইগ্রেশনের প্রতিনিধিরা চলতি বছরের জুলাইয়ে বেনাপোল, হিলি ও বুড়িমারী স্থলবন্দর, সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ও কার্গো ভেহিকল টার্মিনাল পরিদর্শন করেন। কার পাস ব্যবহার করে দুই দেশের চালক-হেল্পারদের যাতায়াতের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় আনার পরামর্শ দেন।

আইনগত বিষয় পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্য কন্ট্রোল অব এন্ট্রি অ্যাক্ট-১৯৫২-এর ধারা ৩ অনুযায়ী, কোনো ভারতীয় নাগরিকের বৈধ ভিসাসহ পাসপার্ট না থাকলে বাংলাদেশের কোনো অংশে প্রবেশ করতে পারবেন না। কাস্টমস আইন ২০২৩-এর ৪৮(৩) ধারা অনুযায়ী, যানবাহনের মালিক, তাঁর প্রতিনিধি বা পরিচালনাকারী ব্যক্তি যানবাহনের আসা ও যাওয়ার আগে নির্ধারিত পদ্ধতিতে যাত্রীর নাম ও তথ্য দাখিল করবেন। চলতি বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জারি করা প্রজ্ঞাপনের বিধি ৪(২) অনুযায়ী, স্থলপথে পণ্যবাহী যানবাহনের আগমন ও প্রস্থানের আগে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তার কাছে ‘ফরম-ক’ অনুযায়ী কার পাস দাখিল করে যানবাহন ও ক্রুর আগমনের অনুমতি নিতে হবে।

সংকট মোকাবেলায় চারটি সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সেগুলো হলো দেশের সব স্থলবন্দরে পণ্য আমদানি-রপ্তানি কাজে নিয়োজিত ট্রাকচালক-হেল্পারদের আসা ও যাওয়া ইমিগ্রেশন পুলিশের মাধ্যমে সম্পন্ন করে ইমিগ্রেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ডেটা এন্ট্রি নিশ্চিত করা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইমিগ্রেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে যাতায়াতের তথ্য অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া। ভেহিকল টার্মিনাল-স্থলবন্দরের নির্ধারিত এলাকায় অবস্থান নিশ্চিত করা ও টার্মিনালের বাইরে অবাধ চলাচল রোধে কঠোর নিয়ন্ত্রণ। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়মিত মনিটরিং, বিশেষ নজরদারি ও সমন্বিত তদারকি জোরদার করা।

Exit mobile version